Thursday, 30 July 2015

খোলা চিঠি... তোমাকে

মাম,

অনেকদিন তোমার সাথে কথা হয়না। আমি বড় হওয়ার পর তো তুমি আমায়ে দেখইনি। আমি কেমন দেখতে, আমার স্বভাব গুলো তোমার মতন কি না, কখনো জানতে ইচ্ছা করে না? সবাই বলে আমি তোমার মত। সত্যি-ই কি তাই? আমি তো তোমায় চিনেছি ওদের গল্প শুনে। ওই যে, ওরা বলে যে তুমি নাকি মাঝরাতে পুকুরের জলে পা ডুবিয়ে বসে রবীন্দ্রসঙ্গীত গাইতে,  প্রচণ্ড  বৃষ্টিতে সবাই যখন বাড়িতে পালাতে পারলে বাঁচে, তখন তুমি দাদু-দিদা-বড়মামা ওদের প্রচণ্ড চিন্তায়ে ফেলে কোথায়ে যেন হারিয়ে যেতে! কই, আমি তো ওরকম পারিনা! আমার তো রাতে দেরী করে ঘুমালে ভয় হয় যে পরের দিন অফিস যেতে পারব কি না! আমার তো বৃষ্টি ভিজলে ভয় লাগে যে আবার জ্বরে পড়বো কি না !! আমি কি তোমার মত হতে পারিনি, মাম?

আমি কি তোমাকে চিনতাম? যতদূর মনে পড়ে আমাদের শেষ কথা হয়েছিল ২০০২ সালে, তোমার প্যারালাইসিস হওয়ার আগে। আমার বয়স তখন ১২। ক্লাস ৭। আমরা একসাথে বোলপুর গেছিলাম, মনে আছে? বোলপুরে গিয়ে দেখেছিলাম রাত্রিবেলা বাবার রবীন্দ্রসঙ্গীতে তোমাকে নাচতে। তুমি তো নাচ শেখনি!! কিভাবে পারতে ওরকম নাচতে? ওরকম প্রান-খোলা গান আর নাচ আমি এই ২৫ বছরের জীবনে আর দেখিনি! ওটাই কি ভালোবাসা? তুমি বাবাকে এতটা ভালবাসতে যে একবার ব্রেন-টিউমার অপারেশন হয়ে যাওয়া সত্ত্বেও ওভাবে নিজেকে উজাড় করে নাচতে পেরেছিলে? তুমি আমায়ে ভালোবাসা দেখিয়েছ, কিন্তু শিখিয়ে যাওনি যে কি করে তোমার মত ভালবাসতে হয়!

আমার মনে পড়ে সেই দুপুরগুলোর কথা, যখন তুমি আমায়ে বকা দিয়ে পড়তে বসাতে, আর তুমি ঘুমিয়ে পড়লে আমি লুকিয়ে লুকিয়ে তোমার বইয়ের তাক থেকে শরৎচন্দ্র রচনাবলী বা শক্তি চাটুজ্যে-র কবিতা সমগ্র পড়তাম। আবার তোমার ঘুম ভাঙ্গার আগে পড়ার বই গুলোকে পাশ-বালিস বানিয়ে দিব্যি ঘুমিয়ে পড়তাম। তুমি জানতে, না মাম? তুমি কি ইচ্ছা করেই আমায় সেই সময়টা একা থাকতে দিতে যাতে তোমার প্রিয় লেখকদের আমি চিনতে পারি?

কবিতা চিনেছি আমি তোমার মুখ থেকে। কি অবলীলায়ে তুমি রবি ঠাকুরের শক্ত-শক্ত কবিতা গুলো আবৃত্তি করতে! বা বৃষ্টি পড়লে ছোট্ট মেয়েদের মত ছড়া কাটতে ‘বৃষ্টি পড়ে টাপুর-টুপুর নদে এলো বান, শিব ঠাকুরের বিয়ে হল তিন কন্যে দান’। শক্তি, জীবনানন্দ, সুনীল, জয় গোস্বামী - আরও কত কত কবির কবিতা তোমার মুখস্ত ছিল। আমি তো কবিদের নামগুলোই ভুলে গেছি! তারপর যখন তোমাকে আমার প্রথম কবিতাটা শুনিয়েছিলাম, মনে আছে তুমি বাবাকে জড়িয়ে ধরে পাগলের মত কেঁদেছিলে? ওটা কি আনন্দের কান্না ছিল, নাকি ভেবেছিলে যে আমি হারিয়ে যাব?

আমি হারাইনি মাম। দেখো, আজও বহাল তবিয়তে বেঁচে আছি। এই কয়েক বছরে আমার জীবনেও অনেক কিছু হয়ে গেছে। ইঞ্জিনিয়ারিং পাশ করেছি। চাকরি পেয়েছি। প্রেম করেছি কয়েকটা, ছাড়াছাড়িও হয়েছে! কষ্টে থেকেছি, আনন্দে থেকেছি, পাগলামো করেছি। আর শেষমেশ এমন একজনকে পেয়েছি যার সাথে সারাজীবন কাটানোর কথা ভাবতে পারি। কিন্তু বিশ্বাস কর, তোমার মত নিয়ম ভাঙ্গতে পারিনি। পারব কি করে? তুমি তো শিখিয়েই যাওনি!!

অনেকে বলে যে ছেলেরা নাকি ৫০-এ বুড়ো হয়। সেই হিসাবে আমার এখন অর্ধ-বার্ধক্য। আজ এই বয়েসে এসে সত্যিই মনে হচ্ছে যে তোমায়ে চেনাটা বড্ড দরকার। সংসারে থেকেও কিভাবে নিয়ম ভাঙ্গতে!, শত অভাব থাকা সত্ত্বেও কিভাবে দুর্গা-পূজো গুলো হাসি মুখে কাটিয়ে দিতে সেটা বোঝা দরকার।

জানিনা এই লেখা তুমি পড়বে কিনা। নিজেকে নাস্তিক বলি (যদিও আজীবন আমি তোমাকে বিশ্বাস করে এসেছি), তাই এটাও হলফ করে বলতে পারিনা যে তোমার কাছে যা চাইব তুমি তাই দেবে। তবে সত্যিই যদি তোমার কাছে কিছু চাইতে হয়, তাহলে দীর্ঘজীবন চাইবনা। এটুকুই চাইব যে যতদিন বেঁচে আছি যেন তোমার মত বাঁচতে পারি। নিয়মের পরোয়া না করে, নিজের অনুভূতি গুলোর সাথে একাত্ম হয়ে যেন প্রান-খুলে বাঁচতে পারি। ওরা বলে যে আমি তোমার মত, আমিও যেন গর্ব করে সব্বাই কে বলতে পারি যে, আমি আমার মায়ের মত! একদম আমার মায়ের মত!


-তোমার মাম্পি

No comments:

Post a Comment

Pageviews